ঢাকা ০৮:০৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মচারীর বিরুদ্ধে কোটি টাকার দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও সহিংসতার অভিযোগ

স্টাফ রিপোর্টার
  • আপডেট সময় : ০৩:৫৯:০৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৫
  • / 367

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের খামারবাড়ি ঢাকার কার্যালয়ে প্রশাসন ও অর্থ উইং বিভাগে কর্মরত প্রধান সহকারী মোঃ শাহাদৎ হোসেন এর বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, আর্থিক অনিয়ম, নারী কেলেঙ্কারি, নিয়োগ-বদলি বাণিজ্য, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি মহাপরিচালকের নিকট দাখিল করা এক লিখিত অভিযোগপত্রে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ
অভিযোগে বলা হয়, শাহাদৎ হোসেন মোহাম্মদপুরের নুরজাহান রোড এলাকায় ১৪৫০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট এবং সরকারি পরিত্যক্ত একটি বাড়ি ভুয়া জাল দলিলের মাধ্যমে দখল করেছেন। এছাড়া তার গ্রামের বাড়িতে নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ কৃষি জমি রয়েছে এবং ব্যাংক একাউন্টে লাখ লাখ টাকার অস্বাভাবিক লেনদেন পাওয়া গেছে।

সংগঠন গড়ে অর্থ আত্মসাৎ
অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, তিনি “প্রশাসনিক কর্মকর্তা বাস্তবায়ন ঐক্য সমিতি” নামে একটি অরেজিস্ট্রিকৃত সংগঠন তৈরি করেন। সাধারণ সম্পাদক পরিচয়ে বন্যার্তদের সাহায্যের নামে বিভিন্ন জেলা, উপজেলা ও অঞ্চল পর্যায় থেকে প্রায় ৯০ লাখ টাকা সংগ্রহ করে আত্মসাৎ করেন। পরবর্তীতে একটি নোটিশের মাধ্যমে সভা স্থগিত ঘোষণা করা হলেও সংগৃহীত টাকা আর ফেরত দেননি।

পদোন্নতি ও বদলি বাণিজ্য
শাহাদৎ হোসেন নিয়ম-নীতি উপেক্ষা করে বিভিন্ন অঞ্চলের কনফারেন্স রুম ব্যবহার করে একক নেতৃত্বে আঞ্চলিক, জেলা ও উপজেলা কমিটি গঠন করেন। সেখানে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন যে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উচ্চমান সহকারী ও প্রধান সহকারীদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা (১০ম গ্রেড) করা হবে। এমনকি অফিস সহকারী, স্টোর কিপার ও ক্যাশিয়ারদেরও পরবর্তীতে পদোন্নতির সুযোগ দেওয়া হবে বলে আশ্বাস দেন। তবে এজন্য প্রায় ২ কোটি টাকা খরচ হবে বলে জানানো হয়।

এ প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করেন প্রধান সহকারী আমিনুল ইসলাম (সরেজমিন উইং) এবং বীনারানী পাল (প্রশাসন উইং)। অভিযোগকারীদের দাবি, পদবী পরিবর্তনের নামে অফিস সহকারী প্রতি ৫ হাজার, উচ্চমান সহকারী প্রতি ১০ হাজার এবং প্রধান সহকারী প্রতি ১৫ হাজার টাকা করে আদায় করা হলেও প্রস্তাবটি কৃষি মন্ত্রণালয়ে গৃহীত হয়নি এবং আদায়কৃত অর্থ ফেরত দেওয়া হয়নি।

অতীতের অনিয়ম
২০২০ সালে খুলনা অঞ্চলের এক সভায় শাহাদৎ হোসেন ব্যক্তিগতভাবে গিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেন। পরে তাকে প্রশাসন ও অর্থ উইং থেকে সরিয়ে ক্রপস উইংয়ে পদায়ন করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, শাখা পরিবর্তনের সময় তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে অফিসের কম্পিউটারের গুরুত্বপূর্ণ নথি মুছে দেন।

তাঁর বিরুদ্ধে বদলি ও পদোন্নতি বাণিজ্যের মাধ্যমে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগে আরও বলা হয়, তিনি উপপরিচালক (জনবল) মোয়াজ্জেম হোসেনের সঙ্গে আঁতাত করে নিয়োগ বাণিজ্য করেছেন। পাশাপাশি বীনারানী পালের সহযোগিতায় কর্মচারীদের সার্ভিস বুকের ফটোকপি নিজের বাসায় সংরক্ষণ করেন।

পদোন্নতিতে অনিয়ম
নিজে ও স্ত্রীকে আগে পদোন্নতি দেওয়ার জন্য জেলা ও অঞ্চল পর্যায়ের ডিপিসি সভা স্থগিত রেখে হেডকোয়ার্টারের ক্ষমতা ব্যবহার করেছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি পদোন্নতির চিঠি কয়েকদিন আটকে রেখে প্রথমে নিজেরা যোগদান করেন, পরে বাকিদের চিঠি বিতরণ করা হয়।

বদলি পরবর্তী অনিয়ম
অভিযোগে বলা হয়, ফরিদপুরে বদলি হওয়ার পরও তিনি অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। সেখানে কর্মকর্তাদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন এবং অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। এ কারণে ফরিদপুর থেকে তাকে পঞ্চগড়ে বদলি করা হয়। পরবর্তীতে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ঢাকার কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে পদায়ন নেন।

সহিংস ঘটনার অভিযোগ
অভিযোগপত্রে বলা হয়, গত ৬ আগস্ট ২০২৪ তারিখে শাহাদৎ হোসেন ১০-১৫ জন সহযোগী নিয়ে খামারবাড়ির মহাপরিচালক ও পরিচালক (প্রশাসন)-এর কক্ষে প্রবেশ করেন। এসময় তারা দেশীয় অস্ত্র ও হাতুড়ি নিয়ে উপস্থিত হয়ে কর্মকর্তাদের গালাগাল করেন এবং প্রাণনাশের হুমকি দেন। অভিযোগে বলা হয়, তিনি একটি ফাইলে জোর করে সই করানোর চেষ্টা চালান। সই না করায় পরে বের হওয়ার সময়ও হত্যার হুমকি দেন।

যদিও ওইদিন অধিকাংশ সিসিটিভি লাইন কেটে দেওয়া হয়, কিন্তু একটি ক্যামেরায় ঘটনাটি ধরা পড়ে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।

রাজনৈতিক যোগাযোগ ও বিদেশে ব্যবসা
শাহাদৎ হোসেনকে আওয়ামী লীগের একজন সিবিএ নেতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়, তিনি বঙ্গবন্ধু পরিষদের সহযোগী হিসেবে খামারবাড়িতে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করার জন্য বিভিন্ন সময় গোপন বৈঠক করেছেন।

এছাড়া গোপন সূত্রের বরাত দিয়ে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, তিনি ভারতের একটি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত এবং ভবিষ্যতে সেখানে স্থায়ী হওয়ার পরিকল্পনা করছেন। এজন্য তিনি ছয় মাসের লিয়েন নিয়ে ভারতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

তদন্ত দাবি
অভিযোগের ভিত্তিতে কৃষি মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি তদন্তের জন্য অবহিত করা হয়েছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মচারীর বিরুদ্ধে কোটি টাকার দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও সহিংসতার অভিযোগ

আপডেট সময় : ০৩:৫৯:০৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৫

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের খামারবাড়ি ঢাকার কার্যালয়ে প্রশাসন ও অর্থ উইং বিভাগে কর্মরত প্রধান সহকারী মোঃ শাহাদৎ হোসেন এর বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, আর্থিক অনিয়ম, নারী কেলেঙ্কারি, নিয়োগ-বদলি বাণিজ্য, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি মহাপরিচালকের নিকট দাখিল করা এক লিখিত অভিযোগপত্রে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ
অভিযোগে বলা হয়, শাহাদৎ হোসেন মোহাম্মদপুরের নুরজাহান রোড এলাকায় ১৪৫০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট এবং সরকারি পরিত্যক্ত একটি বাড়ি ভুয়া জাল দলিলের মাধ্যমে দখল করেছেন। এছাড়া তার গ্রামের বাড়িতে নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ কৃষি জমি রয়েছে এবং ব্যাংক একাউন্টে লাখ লাখ টাকার অস্বাভাবিক লেনদেন পাওয়া গেছে।

সংগঠন গড়ে অর্থ আত্মসাৎ
অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, তিনি “প্রশাসনিক কর্মকর্তা বাস্তবায়ন ঐক্য সমিতি” নামে একটি অরেজিস্ট্রিকৃত সংগঠন তৈরি করেন। সাধারণ সম্পাদক পরিচয়ে বন্যার্তদের সাহায্যের নামে বিভিন্ন জেলা, উপজেলা ও অঞ্চল পর্যায় থেকে প্রায় ৯০ লাখ টাকা সংগ্রহ করে আত্মসাৎ করেন। পরবর্তীতে একটি নোটিশের মাধ্যমে সভা স্থগিত ঘোষণা করা হলেও সংগৃহীত টাকা আর ফেরত দেননি।

পদোন্নতি ও বদলি বাণিজ্য
শাহাদৎ হোসেন নিয়ম-নীতি উপেক্ষা করে বিভিন্ন অঞ্চলের কনফারেন্স রুম ব্যবহার করে একক নেতৃত্বে আঞ্চলিক, জেলা ও উপজেলা কমিটি গঠন করেন। সেখানে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন যে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উচ্চমান সহকারী ও প্রধান সহকারীদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা (১০ম গ্রেড) করা হবে। এমনকি অফিস সহকারী, স্টোর কিপার ও ক্যাশিয়ারদেরও পরবর্তীতে পদোন্নতির সুযোগ দেওয়া হবে বলে আশ্বাস দেন। তবে এজন্য প্রায় ২ কোটি টাকা খরচ হবে বলে জানানো হয়।

এ প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করেন প্রধান সহকারী আমিনুল ইসলাম (সরেজমিন উইং) এবং বীনারানী পাল (প্রশাসন উইং)। অভিযোগকারীদের দাবি, পদবী পরিবর্তনের নামে অফিস সহকারী প্রতি ৫ হাজার, উচ্চমান সহকারী প্রতি ১০ হাজার এবং প্রধান সহকারী প্রতি ১৫ হাজার টাকা করে আদায় করা হলেও প্রস্তাবটি কৃষি মন্ত্রণালয়ে গৃহীত হয়নি এবং আদায়কৃত অর্থ ফেরত দেওয়া হয়নি।

অতীতের অনিয়ম
২০২০ সালে খুলনা অঞ্চলের এক সভায় শাহাদৎ হোসেন ব্যক্তিগতভাবে গিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেন। পরে তাকে প্রশাসন ও অর্থ উইং থেকে সরিয়ে ক্রপস উইংয়ে পদায়ন করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, শাখা পরিবর্তনের সময় তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে অফিসের কম্পিউটারের গুরুত্বপূর্ণ নথি মুছে দেন।

তাঁর বিরুদ্ধে বদলি ও পদোন্নতি বাণিজ্যের মাধ্যমে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগে আরও বলা হয়, তিনি উপপরিচালক (জনবল) মোয়াজ্জেম হোসেনের সঙ্গে আঁতাত করে নিয়োগ বাণিজ্য করেছেন। পাশাপাশি বীনারানী পালের সহযোগিতায় কর্মচারীদের সার্ভিস বুকের ফটোকপি নিজের বাসায় সংরক্ষণ করেন।

পদোন্নতিতে অনিয়ম
নিজে ও স্ত্রীকে আগে পদোন্নতি দেওয়ার জন্য জেলা ও অঞ্চল পর্যায়ের ডিপিসি সভা স্থগিত রেখে হেডকোয়ার্টারের ক্ষমতা ব্যবহার করেছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি পদোন্নতির চিঠি কয়েকদিন আটকে রেখে প্রথমে নিজেরা যোগদান করেন, পরে বাকিদের চিঠি বিতরণ করা হয়।

বদলি পরবর্তী অনিয়ম
অভিযোগে বলা হয়, ফরিদপুরে বদলি হওয়ার পরও তিনি অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। সেখানে কর্মকর্তাদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন এবং অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। এ কারণে ফরিদপুর থেকে তাকে পঞ্চগড়ে বদলি করা হয়। পরবর্তীতে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ঢাকার কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে পদায়ন নেন।

সহিংস ঘটনার অভিযোগ
অভিযোগপত্রে বলা হয়, গত ৬ আগস্ট ২০২৪ তারিখে শাহাদৎ হোসেন ১০-১৫ জন সহযোগী নিয়ে খামারবাড়ির মহাপরিচালক ও পরিচালক (প্রশাসন)-এর কক্ষে প্রবেশ করেন। এসময় তারা দেশীয় অস্ত্র ও হাতুড়ি নিয়ে উপস্থিত হয়ে কর্মকর্তাদের গালাগাল করেন এবং প্রাণনাশের হুমকি দেন। অভিযোগে বলা হয়, তিনি একটি ফাইলে জোর করে সই করানোর চেষ্টা চালান। সই না করায় পরে বের হওয়ার সময়ও হত্যার হুমকি দেন।

যদিও ওইদিন অধিকাংশ সিসিটিভি লাইন কেটে দেওয়া হয়, কিন্তু একটি ক্যামেরায় ঘটনাটি ধরা পড়ে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।

রাজনৈতিক যোগাযোগ ও বিদেশে ব্যবসা
শাহাদৎ হোসেনকে আওয়ামী লীগের একজন সিবিএ নেতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়, তিনি বঙ্গবন্ধু পরিষদের সহযোগী হিসেবে খামারবাড়িতে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করার জন্য বিভিন্ন সময় গোপন বৈঠক করেছেন।

এছাড়া গোপন সূত্রের বরাত দিয়ে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, তিনি ভারতের একটি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত এবং ভবিষ্যতে সেখানে স্থায়ী হওয়ার পরিকল্পনা করছেন। এজন্য তিনি ছয় মাসের লিয়েন নিয়ে ভারতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

তদন্ত দাবি
অভিযোগের ভিত্তিতে কৃষি মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি তদন্তের জন্য অবহিত করা হয়েছে।