চট্টগ্রাম বন্দরে গভীর অন্ধকার: কাস্টমস কর্মকর্তাদের দৌরাত্ম্যে ভয়াবহ দুর্নীতি
- আপডেট সময় : ০৩:৪৫:১৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৫
- / 50
চট্টগ্রাম বন্দর দেশের অর্থনীতির প্রধান প্রাণকেন্দ্র। কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় এখন চলছে ভয়াবহ দুর্নীতির মহোৎসব। পণ্য ডেলিভারির প্রতিটি ধাপে কাস্টমস কর্মকর্তাদের উৎকোচবাজি এমন মাত্রায় পৌঁছেছে যে, ব্যবসায়ীদের বন্দরকে এখন বলা হচ্ছে “দুর্নীতির কলোজোন”।
ঘুষ ছাড়া ছাড় হয় না পণ্য
বন্দর দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার কন্টেইনার আসে। এসব পণ্যের মূল্য নির্ধারণ ও ছাড়পত্রের কাজ করে কাস্টমস বিভাগ। কিন্তু এখানে পণ্য ছাড়তে ব্যবসায়ীদের বাধ্য করা হচ্ছে ঘুষ দিতে। অভিযোগ রয়েছে, পণ্যের ধরনভেদে ঘুষের পরিমাণ ১ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত।
পণ্য ছাড়ের প্রক্রিয়ায় দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা (ARO), রাজস্ব কর্মকর্তা (RO) ও ডেপুটি কমিশনার (DC)–এর কয়েকজন কর্মকর্তা এই অনৈতিক অর্থ আদায়ের সঙ্গে জড়িত।
এবিষয়ে একজন আমদানিকারক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “কাগজে সামান্য ভুল পেলেই কর্মকর্তারা বলে দেন, ‘অতিরিক্ত পণ্য এসেছে’—এই অজুহাতে টাকা দিতে হয়। না দিলে পণ্য আটকে রাখেন।”
দালালচক্রের দৌরাত্ম্য
কাস্টমস ভবনের ভেতরে ও বাইরে সক্রিয় রয়েছে দালালচক্র। তারা কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীর মধ্যে মধ্যস্থতা করে ঘুষের লেনদেন নিশ্চিত করে। বিনিময়ে কমিশন পায় এই দালালরা। অনেক সময় দেখা যায়, একেকটি কন্টেইনার ছাড়াতে ব্যবসায়ীর হাতে ৫-৬ জন দালাল ঘুরছে। এমনকি রাজস্ব কর্মকর্তা (RO) ও ডেপুটি কমিশনার (DC) স্বয়ং কন্টেইনার লোডিং ও আনলোডিং এর সময় সেখানে নানা তালবাহানা করে আমদানিকারককে বিভিন্ন ভয়ভীতি দেখিয়ে হয়রানি করছে।
নবনিযুক্ত কর্মকর্তারাও জড়িত
নবনিযুক্ত কিছু ডেপুটি কমিশনার পদোন্নতির সঙ্গে সঙ্গেই এই চক্রের অংশ হয়ে পড়েছেন। তাদের প্রভাবে নিচের কর্মকর্তারাও অনিয়মে উৎসাহী হচ্ছেন। সূত্র জানায়, এসব কর্মকর্তা ঘুষের টাকা ভাগাভাগি করেন উচ্চপদস্থ মহলের সঙ্গে।
বন্দর কার্যক্রমে স্থবিরতা ও অর্থনৈতিক ক্ষতি
এই দুর্নীতির কারণে পণ্য ছাড়ে সময় লাগছে ২ থেকে ৫ দিন বেশি। এতে ব্যবসায়ীদের ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে বহুগুণে। প্রতি বিলম্বিত দিনে বাড়ছে ডেমারেজ ও গুদাম চার্জ, যা শেষ পর্যন্ত সাধারণ জনগণের ওপর গিয়ে পড়ছে পণ্যমূল্য বৃদ্ধির মাধ্যমে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বন্দরের কার্যক্রমে এই দুর্নীতি দেশের আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়াকে অচল করে দিতে পারে, যা জাতীয় অর্থনীতির জন্য হুমকিস্বরূপ।
ভুক্তভোগীরা জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ও দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসনিক বিভাগকে অবিলম্বে এক স্বতন্ত্র তদন্ত শুরু করার আহ্বান করা হচ্ছে — যাতে বন্দর কাস্টমস কর্মকর্তাদের কার্যক্রমে বর্তমানে প্রচলিত উৎকোচ-চক্র চিহ্নিত ও প্রতিহত করা যায়।
এবিষয়ে ভুক্তভুগিরা বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর কাস্টমস বিভাগকে দুর্নীতিমুক্ত করতে হলে দুদক ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার যৌথ অভিযান চালাতে হবে। তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ইতিমধ্যে দুদক তদন্ত শুরু করেছে বলে জানা গেছে।
চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের বাণিজ্য প্রবাহের হৃদপিণ্ড। কিন্তু সেখানের কাস্টমস বিভাগে যখন দুর্নীতি ও উৎকোচবাজি দৈনন্দিন বাস্তবতা হয়ে দাঁড়ায়, তখন অর্থনীতির প্রাণশক্তিই হুমকির মুখে পড়ে। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আনলে দেশের প্রবেশদ্বার খ্যাত বন্দরই পরিণত হতে পারে “দুর্নীতির দুর্গে”।















